আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়-মাছের কৌলিতাত্ত্বিক উন্নয়ন ও ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা
মাছের কৌলিতাত্ত্বিক উন্নয়ন ও ব্রুডস্টক ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ ও উন্মুক্ত জলাশয়সমূহের গুরুত্ব অপরিসীম। এই জলাশয়সমূহে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছের আবাস, যার মধ্যে রুই জাতীয় মাছের চাষের ব্যাপকতা বেশি । বাংলাদেশের মৎস্য চাষের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলেও প্রাকৃতিক পরিবেশে বৈচিত্র্যময় মৎস্য প্রজাতি তার বংশগত বৈশিষ্ট্যের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে চলছে।
কালের বিবর্তনে এই ধারার কিছুটা বিচ্যুতি ঘটলেও বাংলাদেশের স্বাদুপানির মাছের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে যার মধ্যে রুই জাতীয় মাছের অবদানই সর্বাধিক । বর্তমানে চাষকৃত মাছের সামগ্রিক উৎপাদনের প্রায় ৯৯.৫% ভাগই আসছে হ্যাচারিতে উৎপাদিত কৃত্রিম রেণু পোনা থেকে এবং অবশিষ্ট প্রায় ০.৫% পোনা নদী উৎস থেকে প্রাপ্ত ।
ফলে হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনার বংশগত গুণাবলি প্রাকৃতিক উৎসের পোনার অনুরূপ না হওয়ায় খামারী পর্যায়ের উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে যা ভবিষ্যতে মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে প্রাকৃতিক উৎস থেকেই রুই জাতীয় মাছের রেণু সংগ্রহ করে পোনা উৎপাদন করা হতো। কিন্তু নানাবিধ কারণে এ উৎস থেকেই মালিকগণ নিম্নমানের পোনা তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যা মাছচাষের ক্ষেত্রে বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
ব্রুড ব্যাংক স্থাপনের গুরুত্ব :
ব্রুড মাছ বলতে প্রজননে ব্যবহৃত বয়ঃপ্রাপ্ত স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে বুঝায়। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতেরপোনা উৎপাদনে ব্রুড মাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রুড ব্যাংক হলো এমন একটি স্থান যেখানেবিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছ বা উন্নত জাতের পোনা উৎপাদনের জন্য বিপুল সংখ্যক মাছকে প্রাকৃতিক উৎসথেকে সংগ্রহ করে পুকুরে বা হ্যাচারিতে অতি যত্ন সহকারে প্রতিপালন করেকৌলিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণকরা হয় ।
উক্ত স্থান বা কেন্দ্র থেকে অন্যান্য হ্যাচারিতে ব্রুড মাছ সরবরাহ করা হয় বা পোনা উৎপাদন করে
তা বিতরণ করা হয় ।
কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিপুল জনগোষ্ঠীর দারিদ্রতা বিমোচন, কর্মসংস্থান, প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাবনাময় এ খাতের ব্যাপক বিস্তৃতির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন উন্নতমানের বীজ বা পোনা উৎপাদন এবং তা মাছ উৎপাদনকারীদের সরবরাহ করা।
বীজ ভালো না হলে যেমন ফসলের ফলন ভালো হয় না, তেমনি পোনা গুণগতমান সম্পন্ন না হলে পুকুর বা জলাশয়ে মাছের উৎপাদন আশানুরূপ পাওয়া যায় না । অতীতে প্রাকৃতিক উৎস থেকে রুই জাতীয় মাছের রেণুপোনা সংগ্রহ করে পোনা উৎপাদন করা হতো। কিন্তু নানাবিধ প্রাকৃতিক ও মানুষ সৃষ্ট কারণে এ উৎস থেকে আহরণ কমে গেছে ।
অপর দিকে মৎস্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারণকার্যক্রমের ব্যাপকতার জন্য মাছ চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হওয়ায় রেণু পোনার চাহিদা বেড়েছে। এ চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে দেশে সরকারি এবং বেসরকারি হ্যাচারি মিলিয়ে নয় শতাধিকের ঊর্ধ্বে হ্যাচারি গড়ে উঠেছে । অধিকাংশ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননের কেন্দ্র ইতিমধ্যে বিনষ্ট হয়ে যাওয়ায় হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনই হলো পোনা প্রাপ্তির প্রধান উৎস।
কৃত্রিম প্রজননের জন্য উন্নতমানের গুণসম্পন্ন ব্রুডই হলো ভালো পোনা প্রাপ্তির পূর্বশর্ত। মাছের কৃত্রিম প্রজনন দেশে রেণু ও পোনা প্রাপ্তিতে বিশেষ অবদান রাখছে। রেণু পোনা উৎপাদনে পরিমাণগত অগ্রগতি হলেও এর গুণগত মানের যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে । গুণগত বৈশিষ্ট্যের অবক্ষয়ের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে ব্রুড মাছের বিজ্ঞানভিত্তিক নির্বাচন ও পরিচর্যার অভাব, অন্তঃপ্রজনন সমস্যা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অধিক মুনাফা লাভের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত সংকরায়ণ সহ অপরিপক্ব মাছের কৃত্রিম প্রজনন।
ফলে পোনার কাঙ্খিত বৈশিষ্ট্যগুলোর অবনতি হওয়ায় মৎস্য চাষিরা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা মাছ চাষের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। ইদানীং হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনার উৎপাদনশীলতা হ্রাস, দৈহিক বিকৃতি, রোগ-বালাই এবং ব্যাপক পোনা মৃত্যুহার সম্পর্কে প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে পোনা উৎপাদনে অন্তঃপ্রজনন, প্রজননক্ষম স্ত্রী ও পুরুষ মাছ বাছাইয়ে অসচেতনতা (অর্থাৎ ঋণাত্মক নির্বাচন প্রবণতা) এবং অপরিকল্পিত সংকরায়ণজনিত কারণে এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে ।
বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি / বেসরকারি হ্যাচারিগুলোতে উৎপাদিত পোনার গুণগত মান দিন দিন কমে যাওয়ার পিছনে মৎস্য বিজ্ঞানীরা যে কারণকে বিশেষভাবে দায়ী করছেন তার মধ্যে অন্তঃপ্রজনন হলো অন্যতম । বংশগতভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের স্ত্রী ও পুরুষ মাছের প্রজননকে অন্তঃপ্রজনন বলা হয় । হ্যাচারিতে এ সমস্যা দু’ভাবে হতে পারে ।
* বংশগত ভাবে অতি ঘনিষ্ঠ ব্রুড মাছের প্রজনন ঘটানোর মাধ্যমে ।
* একই ব্রুড থেকে উৎপাদিত ভাই-বোন সম্পর্ক পোনা বড় করে এদের মধ্যে প্রজনন ঘটানো ।
অন্তঃপ্রজননের ফলে কৌলিকতাত্ত্বিক সমসত্ত্বতার মাত্রা (Degree of Homozygosity) বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং কৌলিতাত্ত্বিক অসমসত্ত্বতার (Degree of Homozygosity) মাত্রা কমতে থাকে । কৌলিতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, ভাই-বোন সম্পর্কের মাছের মধ্যে প্রজননে এক জেনারেশনেই সব গুণাগুণের শতকরা ২৫ ভাগ হ্রাস পায় এবং জেনারেশন থেকে জেনারেশনে অবক্ষয়ের এ ধারা চলতে থাকে ।
অনুরূপভাবে মা ও ছেলে এবং মেয়ে ও পিতা সম্পর্কের মাছের মধ্যে প্রজনন ও কৌলিতাত্ত্বিক অবক্ষয় দেখা দেয় অর্থাৎ পিতা-মাতা বংশগতভাবে যতটা ঘনিষ্ঠ হবে পরবর্তী বংশধরের উপর কৌলিতাত্ত্বিক অবক্ষয়ের প্রভাবের মাত্রা তত বেশি হবে। ফলে মাছের উৎপাদনশীলতা হ্রাস, বিকলাঙ্গতা, রোগ-বালাইয়ের সমস্যা, ডিমের সংখ্যা (Facundity ) কমে যাওয়া ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয় । তাছাড়া ব্রুড মাছের ঋণাত্মক নির্বাচন প্রবণতা (Negative Selection), অপরিকল্পিত সংকরায়ণ, অপরিণত (Immature)
মাছের প্রজনন ইত্যাদি কারণে ও উৎপাদিত পোনা শারীরিকভাবে দুর্বল হয় যা অধিক হারে পোনা মৃত্যুর কারণসহ কাঙ্ক্ষিত ফলন দিতে ব্যর্থ হয় ।
উপরোক্ত সমস্যাগুলোর নিরসনে মৎস্য অধিদপ্তরাধীন সারাদেশে ৬টি বিভাগের ১২টি হ্যাচারি / খামারে প্রাকৃতিক উৎসের রেণু সংগ্রহ করে উন্নতমানের ব্রুড উৎপাদনপূর্বক সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি মালিকদের নিকট স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করছে ।
ব্রুড ব্যাংক স্থাপন প্রকল্পের আওতাধীন হ্যাচারি / খামারের তালিকা :

ব্রুড ব্যাংকের মাধ্যমে নিম্নবর্ণিত কার্যসমূহ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে :
i. নদীর উৎস থেকে বন্য জাতের মাছ (Wild Palsm) (রুই জাতীয় মাছের ক্ষেত্রে হালদা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র, পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদী) সংগ্রহ করে সংগৃহীত স্টকের মধ্যে নির্বাচিত প্রজনন (Selective Breeding) বা লাইন ক্রসিং (Line Breeding) কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নত জাতের ব্রুড মাছ উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা ।
ii. যথাসম্ভব সকল সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন হ্যাচারিসমূহকে উন্নত জাতের ব্রুড স্টক সংরক্ষণ, ব্যবহার ও বিতরণ নেটওয়ার্কের মধ্যে আনা ।
iii. আগ্রহী উদ্যোক্তা, হ্যাচারি মালিক/হ্যাচারি অপারেটর ও হ্যাচারি ব্যবস্থাপকদের উন্নতমানের মাছের
পোনা উৎপাদনের কলাকৌশল ও কারিগরি পরামর্শ প্রদানের উৎস হিসেবে কাজ করা ।
বিলুপ্তপ্রায় (Endangered) দেশিয় রুই জাতীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ও দেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে তা বিতরণের ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা । v. ব্রুড স্টক ও সার্বিক হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দেশের সরকারি হ্যাচারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন হ্যাচারি অপারেটরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ।
রুই জাতীয় মাছের কৌলিতাত্ত্বিক তথা বংশগতিধারা যে সমস্ত কারণে বিনষ্ট হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হচ্ছে—
অন্তঃপ্রজনন :
বংশগতভাবে নিকট সম্পর্কের স্ত্রী ও পুরুষ মাছের প্রজননকে অন্তঃপ্রজনন বলে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারিগুলোতে উৎপাদিত পোনার গুণগতমান দিন দিন কমে যাওয়ার পেছনে অন্তঃপ্রজনন হলো অন্যতম। এই অন্তঃপ্রজননের ফলে কৌলিতাত্ত্বিক সমস্বত্ত্বতার মাত্রা (Degree of Homozygosity) বৃদ্ধি পেতে থাকে । হ্যাচারিতে অন্তঃপ্রজনন দুই উপায়ে ঘটতে পারে। যেমন-
১. বংশগতভাবে অতি ঘনিষ্ঠ ব্রুড মাছের মধ্যে প্রজনন ঘটানো ।
২. একই ব্রুড মাছ থেকে উৎপাদিত ভাই-বোন সম্পর্কীয় মাছের মধ্যে প্রজনন ঘটানো ।

কৌলিতাত্ত্বিক গবেষণা করে দেখা গেছে যে, ভাই-বোনের প্রজননের ফলে উৎপাদিত মাছ প্রতিটি বংশধারায় তার মূল বৈশিষ্ট্যের শতকরা ২৫ ভাগ হারিয়ে ফেলে, এই ক্রসকে সিব ক্রস (Sib Cross) বলে। সিব ক্রসের ফলে
উৎপাদনশীলতা হ্রাস, বিকলাঙ্গতা, রোগবালাইয়ের সমস্যা, ডিমের সংখ্যা কমে যাওয়াসহ নানাবিধ সমস্যার উন্মেষ ঘটে । অন্তঃপ্রজনন সমস্যা দূর করার জন্য নিম্নোক্ত উপায়সমূহ অবলম্বন করতে হবে ।
১). প্রজননের জন্য উপযুক্ত বয়স ও ওজনের ব্রুড মাছ ব্যবহার করা :
প্রজননের জন্য ছোট আকারের ব্রুড মাছ ব্যবহার পরিহার করতে হবে। প্রজননক্ষম ব্রুড মাছ নির্বাচনে প্রতিটি মৎস্য প্রজাতির ক্ষেত্রে উপযুক্ত বয়স ও ওজনের জন্য সুনির্দিষ্ট মান অনুসরণ করা উচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে নানা প্রজাতির ব্রুড মাছ ব্যবহার করা হয়। হ্যাচারিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন মৎস্য প্রজাতির প্রজনননোপযোগী বয়স ও ওজনের একটি ছক নিচে দেওয়া হলো :

হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদনে কৌলিতাত্ত্বিক সমস্যা ও প্রতিকার
২) হ্যাচারি সমূহের মধ্যে ব্রুড মাছ বিনিময় :
সম্ভব হলে প্রতি বছর বা প্রতি দুই/তিন বছর অন্তর অন্তর এক হ্যাচারি থেকে অন্য হ্যাচারিতে ব্রুড বিনিময়ের ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এক্ষেত্রে এক হ্যাচারির পুরুষ মাছ অন্য হ্যাচারির স্ত্রী মাছের সাথে বিনিময়ই উৎকৃষ্ট পন্থা। এটিও নিশ্চিত হতে হবে যে, বিনিময়যোগ্য ব্রুড মাছ যেন হ্যাচারিসমূহের নিজস্ব উৎপাদন হয় ।
৩) দ্রুত বর্ধনশীল পোনা বাছাই করে ব্রুড তৈরি করা :
হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা থেকে ব্রুড মাছ তৈরি করতে হলে যতটা সম্ভব প্রজাতিভেদে বেশি লট উৎপাদন করা প্রয়োজন । প্রত্যেক জোড়া ব্রুড থেকে প্রাপ্ত পোনার সংখ্যাকে একটি করে লট ধরা যেতে পারে। এ থেকে দ্রুত বর্ধনশীল অল্প সংখ্যক আঙ্গুলী পোনা বাছাই করতে হবে । অনেকগুলো লট থেকে বাছাইকৃত পোনাগুলোকে একসাথে করে আলাদা পুকুরে ব্রুড স্টক হিসেবে পরিচর্যা করতে হবে। তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের মাছ থেকে ব্রুড তৈরি করা মোটেই সমীচীন হবে না ।
(৪) প্রাকৃতিক উৎস থেকে ব্রুড মাছ সংগ্রহ করা :
প্রতি তিন বছর বা পাঁচ বছর অন্তর অন্তর যমুনা, ব্রহ্মপুত্র বা হালদা প্রভৃতি নদী থেকে পোনা সংগ্রহ করে ব্রুড স্টক তৈরি করা সম্ভব হলে খুব ভালো হয় । এসব স্টক থেকেও দ্রুত বর্ধনশীল পোনা আলাদা করে ব্রুড মাছ তৈরি করা আবশ্যক । এসব ব্রুড থেকে উৎপাদিত মাছের পোনা স্বাভাবিকভাবে উৎপাদনে সহায়ক হতে পারে ।
৫) অতি ঘনিষ্ঠ ব্রুড মাছ ব্যবহার না করা :
অতি ঘনিষ্ঠ বলতে বংশগতভাবে অত্যন্ত কাছাকাছি অর্থাৎ একই জোড়া ব্রুড মাছ থেকে প্রাপ্ত ভাই-বোন সম্পর্কের পোনা বা এসব পোনা বড় করে মা/বাবা সম্পৰ্কীয় ব্রুডের সাথে প্রজনন ঘটানোর কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হবে। এই ব্যাপারে হ্যাচারি অপারেটরদের অবশ্যই পোনা বা ফ্রডের স্টক শনাক্ত করে অন্তঃপ্রজনন প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬) সংকরায়ণের উদ্যোগ পরিহার করা :
ভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে অপরিকল্পিত সংকরায়ণে যেহেতু বংশপর্যায়ে স্টক নিম্নমানের হয়ে কম উৎপাদনশীলতার সমস্যা বা এদের প্রভাবে দেশীয় স্টকের বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তাই ব্যক্তি মালিকানাধীন হ্যাচারি অপারেটরদের এই প্রচেষ্টা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে ।
৭) হ্যাচারির সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা :
উল্লেখিত বিষয়সমূহের প্রতি যত্নবান হওয়ার পাশাপাশি হ্যাচারি অপারেটরগণ তাদের হ্যাচারির ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে বিশেষ নজর দেবেন । কেননা আদর্শ এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার দ্বারাই হ্যাচারির সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব । তাই নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো সকল হ্যাচারি অপারেটরদের মেনে চলা অত্যাবশ্যক –
i. পরিমিত সংখ্যক ব্রুড মাছ মজুদকরণ;
ii. ব্রুড মাছের পুকুরে নিয়মিত পানি সরবরাহকরণ;
iii. ব্রুড মাছের পুকুরে সুষম খাদ্য প্রয়োগ;
iv. ব্রুড মাছের রোগ-বালাই শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাকরণ;
v. পুকুরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া;
vi. ইনকিউবেশন পুল বা জারে পরিমিত পরিমাণ ডিম মজুদকরণ;
vii. ইনকিউবেশন পুল বা জার নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা;
viii. নার্সারি পুকুরে পরিমিত সংখ্যক রেণুপোনা মজুদকরণ এবং তার ব্যবস্থাপনা ।
৮) চক্রক্রমিক লাইন ক্রসিং পদ্ধতি ব্যবহার :
চক্রক্রমিক লাইন ক্রসিং পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্তঃপ্রজনন দূর করা যায় ।
৯. কুলনামা (Pedigree) :
কুলনামা হলো ফ্যামিলি পরিচিতি, যার মাধ্যমে আমরা মাছের বংশপরস্পরায় যাবতীয় তথ্য যেমন— মাছের পূর্ব ইতিহাস, উৎস, সংগ্রহের সময়কাল, বয়স, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সহজে
জানা যায় ।
কুলনামা সংরক্ষণের সুবিধাসমূহ :
i) মাছের পূর্ব ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় । যেমন : উৎস / প্রাপ্তি, সংগ্রহের তারিখ, বয়স, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ।
ii) মাছগুলো ব্রুড হিসাবে কতবার হ্যাচারিতে ব্যবহৃত হয়েছে ।
iii) কোনো কোনো স্টক এর মাছ প্রজনন অক্ষয় তা সহজেই নিরূপণ ।
iv) পরিবেশগত কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল কি না তা জানা ।
v) কোনো প্রজাতির মাছ নতুন করে ব্রুড হিসেবে প্রতিস্থাপন প্রয়োজন ।
iv) অন্তঃপ্রজনন ঘটানোর সুযোগ কম থাকে ।
নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশ দূষণের ফলে জলাশয়গুলোতে আজ অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি বিরাজমান । এর ফলে, মাছের রোগ-বালাই বৃদ্ধিসহ দেশের সার্বিক বন্য পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে প্লাবনভূমি ও উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ, নদী-নালার গভীরতা হ্রাস, ধানক্ষেতে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, বিভিন্ন জলাশয়ে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধনের প্রবণতা ইত্যাদি কারণে উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশের মৎস্য উৎপাদন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
এই অবস্থায় মৌসুমি ও মেয়াদি পুকুর, দীঘি, ডোবা, ছোটখাটো বিল ও অন্যান্য প্লাবনভূমিতে প্রযুক্তিনির্ভর চাষের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল । কিন্তু বর্তমানে হ্যাচারিতে মাছের কৃত্রিম প্রজননে ব্যবহারযোগ্য ব্রুড মাছ ও উৎপাদিত পোনার স্টকে সম্ভাব্য কৌলিতাত্ত্বিক অবক্ষয়জনিত সমস্যা এই সম্ভাবনার পথে এক বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই আমাদের মূল্যবান মৎস্যসম্পদকে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্যে উৎপাদন কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞানী, পরিকল্পনাবিদ ও রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা এই সম্পদ রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না ।
