আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়-ব্যাকটেরিয়াল রোগের প্রতিকার
ব্যাকটেরিয়াল রোগের প্রতিকার
ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ
মাছ চাষ ব্যবস্থাপনায় নার্সারি পরিচালনা, চারা পুকুরে পোনা পালন এবং মজুদ পুকুরে মাছ চাষের ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে । মাছ চাষিদের কাছে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের সমস্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে । যথাসময়ে ব্যাকটেরিয়াজনিত সমস্যা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ পুকুরে চাষকৃত মাছ পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলতে পারে ।
মাছ চাষে ব্যাকটেরিয়াজনিত বহু রোগের সংক্রমণ ঘটে থাকে । ব্যাকটেরিয়াজনিত মাছকে প্রাথমিক জীবাণু হিসেবে অথবা মাছের কোনো ক্ষত বা ঘায়ের মাধ্যমিক সংক্রামক হিসেবে রোগাক্রান্ত করে থাকে ।
ব্যাকটেরিয়াজনিত ফুলকা পচা রোগ (Bacterial gill disease) রোগজীবাণু : মিক্সোকক্কাস পিসিকলাস (Mixococcus piscicolus) নামের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের এ রোগ দেখা দেয় ।
রোগের বিস্তার :
গ্রাসকার্প এবং কমন কার্পের পোনা ও আঙ্গুলে পোনায় এ রোগ বেশি দেখা দেয় । এরোগে আক্রান্ত মাছের বৃদ্ধি কমে যায় এবং বাঁচার হার (survival rate) হ্রাস পায় । দেকি কার্পজাতীয় মাছেও এ রোগ দেখা যায় । গ্রাস কার্পের জন্য এটি একটি মারাত্মক রোগ। সাধারণত ২৮°-৩০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় ।
তাপমাত্রা ১৫° সেলসিয়াসের নিচে গেলে এ রোগ সাধারণত হয় না এবং তাপমাত্রা ২০° সেলসিয়াসে উঠলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয়। জলজ পরিবেশের অবনতিশীল অবস্থা, যথা- তলদেশে ক্ষতিকর জৈব পদার্থ জমা হওয়া এবং মাছের অধিক ঘনত্ব এ রোগের সহায়ক নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এ রোগ বছরব্যাপী হয়ে থাকে। এ রোগে ব্যাকটেরিয়া মাছের ফুলকাকে আক্রান্ত করে । এটি একটি সংক্রামক রোগ এবং খুবই দ্রুত ছড়ায় ।
i. রোগের লক্ষণ
ii. মাছের দেহ, বিশেষ করে মাথা কালচে বর্ণ ধারণ করে ।
iii. মাছের বৃদ্ধি হ্রাস পায় ৷
iv. মাছের ক্ষুধা হ্রাস পায় এবং মাছ এবড়ো-থেবড়ো চলাফেরা করে ।
v. মাছের ফুলকারশ্মি কাদা ও অধিক পিচ্ছিল পদার্থে আবৃত থাকে ।
vi. মাছের ফুলকা ফুলে যায়, ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করে ও পচে যায় ।
vii. মারাত্মক অবস্থায় মাছের কানকো পচে যায় এবং কানকো স্বচ্ছ দেখায় ।
viii. আক্রান্ত মাছের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিদিন মারা যেতে পারে ।

ব্যাকটেরিয়াল রোগের প্রতিকার
Pseudomonas fluorescens Aeromonas hydrophila এবং অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত মাছের রক্ত ক্ষরণসহ নানা লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর মধ্যে ড্রপসি (পেটফুলা) রোগও হতে পারে । এ সকল রোগ হলে বা রক্ত সংক্রমিত হলে সাধারণত এন্টিবায়োটিকের চিকিৎসা ছাড়া আর উপায় থাকে না । তখন উপরিউল্লিখিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হবে। এ সকল ক্ষেত্রে ‘অক্সোলিনিক এসিড (Oxolinic Acid) প্রতিদিন ৩ মি. গ্রাম হারে প্রতি কেজি মাছে খাবারের মাধ্যমে ৫ দিন পর্যন্ত প্রয়োগ করতে হবে।
আবার গোসলের জন্য ১-২ পি.পি.এম এই ঔষধ দ্রবণে ১ দিন পর্যন্ত আক্রান্ত মাছকে রাখলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া পুকুরের পানিতে অক্সিজেন কম থাকার কারণে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ হলে ২-৫ পি.পি.এম পটাশ (পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, KMnO4) প্রয়োগ করলে কিছু ফল পাওয়া যায় । অল্প সংখ্যক মাছ হলে ১৫-২০ পি.পি.এম পটাশ দ্রবণে এক ঘণ্টা পর্যন্ত গোসল করানো যেতে পারে। বর্তমানে ছুঁতে (কপার সালফেট, CuSO4, 5H20) খুব বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সাধারণত এর প্রয়োগ পুকুরে একেবারে অনুচিত।
তবে অল্প সংখ্যক আক্রান্ত মাছকে আলাদা করে ০.৫-২ পি.পি.এম ছুঁতে দ্রবণে ৩০ মিনিট সময় পর্যন্ত গোসল করানো যেতে পারে।
জেনেটিক রোগ
আজকাল অধিকাংশ হ্যাচারিতে মৎস্য প্রজননের পর উৎপন্ন রেণু পোনার দৈহিক বিকৃতি বা বিকলাঙ্গতা দেখা যায় । ডিম ফুটে বের হবার পর থেকে ব্যাপক হারে রেণু মারা যায়। ব্রুড মাছ বাছাই এ ঋণাত্মক নির্বাচন, নিকট আত্মীয় পুরুষ ও স্ত্রী মাছের মধ্যে প্রজনন এবং অপরিকল্পিত সংকরায়ণের জন্য উৎপন্ন রেণু পোনার মধ্যে এ ধরনের জেনেটিক রোগ দেখা যায় ।
প্রতিকারের উপায় ।
১. প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রজননের জন্য ব্রুড মাছ সংগ্রহ করা।
২. দূর-দূরান্তের বিভিন্ন হ্যাচারির মধ্যে ব্রুড মাছ বিনিময় করা এবং প্রজনন কাজে ব্যবহার করা।
৩. ব্রুড মাছ যথেষ্ট বড় ও পরিপত্ব না হলে তাদের দিয়ে প্রজনন করানো থেকে বিরত থাকা । ৪. সরকারি ব্যবস্থায় গড়ে উঠা ব্রুড ব্যাংক হতে প্রজননের জন্য ব্রুড মাছ সংগ্রহ করা।
পরজীবী, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসজনিত রোগের প্রতিকার পদ্ধতি
মাছের সাদা দাগ রোগ (White spot) ও ট্রাইকোডাইনিয়াসিস (Trichodiniasis), কসটিয়াসিস
(Costiasis)
নীলাভ দাগ রোগ
রেণুপোনা সাধারণত এই রোগ দেখা গেছে। পেটের নিচে বা কুসুম থলিতে ঈষৎ নীল বর্ণের দাগ দেখা দিয়ে যে অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করে তাকেই নীলাভ দাগ রোগ বলে চিহ্নিত করা হয় । বিভিন্ন মাছের নিষিক্ত ডিম থেকে উদ্ভূত লার্ভা এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় । এই রোগে লার্ভার দেহে পানি জমা হয়, স্বাভাবিক আকারের পরিবর্তন ঘটে ও কুসুম থলির (Yolk Sac) রং এর পরিবর্তন ঘটে। এই রঙের পরিবর্তন উজ্জ্বল নীল বা বাদামি হতে পারে ।
কখনও কখনও কুসুম থলিতে সাদা দাগ দেখা যায়। এই রোগে লার্ভার মজুদে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে থাকে যদিও এ রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি । তবে পানিতে ভারী ধাতুর আয়নের অধিক ঘনত্ব, দ্রবীভূত অ্যামোনিয়ার উচ্চহার ও পরিস্ফুটন ট্রে (Hatching Tray) তে কাঁকরের পরিমাণ হ্রাস পেলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে।
সুস্থ ও সবল প্রজননক্ষম মাছ ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ কারিগরি জ্ঞানের দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে এই রোগের প্রকোপ হ্রাস করা যায় ।

ইয়োক স্যাক রোগ (Yolk Sac Disease)
নিষিক্ত ডিম থেকে পরিস্ফুটনের (Hatch out) পর যে লার্ভা বের হয় তার কুসুম থলিতে যে সকল অস্বাভাবিক অবস্থা দেখা দেয় তাকে ইয়োক স্যাক রোগ বলে । মাছের লার্ভা বা রেণু পোনা বিভিন্ন রোগ বালাইয়ের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল (Sensitive)। রেণুপোনার আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম (Defence mechanism) নাজুক হবার কারণে এর সহজেই রোগাক্রান্ত হয় ।
ইয়োক স্যাক রোগ বা কুসুম থলির রোগ এগুলোর মধ্যে অন্যতম । এই রোগে কুসুম থলির স্বাভাবিক রংঙের পরিবর্তন ঘটে বাদামি বর্ণ ধারণ করে ও কখনও কখনও কুসুম থলিতে সাদা দাগ দেখা যায়। এই রোগে নার্সারির লার্ভার মজুদে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে, এমনকি সম্পূর্ণ মজুদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অসম্পূর্ণ পরিপক্ক রোগাক্রান্ত মাছ থেকে ডিম সংগ্রহের ফলে এই রোগের প্রকোপ বেশি হচ্ছে, যদিও এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।
তবে পানিতে ভারী ধাতুর (Heavy metal) আয়রনের অধিক ঘনত্বজনিত দূষণ, দ্রবীভূত অ্যামোনিয়ার উচ্চহার ও হ্যাচারির অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। রেণুপোনাগুলোকে স্থানান্তরের সময় এদের যান্ত্রিক ক্ষত (Mechanical Injury) হতে পারে । নিষিক্ত ডিমগুলো পরিস্ফুটন ট্যাংকে পরিস্ফুটনের সময় বায়ু সঞ্চালন (Aeration) বেশি হলে অনেক সময় কুসুম থলি বা লার্ভার মুখে Gas bubble দেখা দিতে পারে । এই সময় সতর্কতার সাথে বায়ু সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ।
এছাড়া বিভিন্ন পারিবেশিক পীড়নের (Environmental Stress) কারণে কুসুম থলির রোগ হতে পারে । সুস্থ, সবল ও পরিপক্ক প্রজননক্ষম মাছের ব্যবহার এই রোগের আশঙ্কা কমাতে পারে । নিষিক্ত ডিমগুলোকে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন মেশানো পানিতে ধৌত করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। পরিচ্ছন্ন দূষণমুক্ত হ্যাচারি পরিবেশ ও যথাযথ কারিগরি জ্ঞানের দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে পারে ।
