মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন

মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন : মাছ আমাদের নিত্য আবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিহাস সাক্ষী দেয় আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। সময়ের পরিক্রমায় মাছ নিয়ে আমরা মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলাম। সরকারের সুষ্ঠু ও বাস্তবভিত্তিক যৌক্তিক নীতি এবং কর্মসূচির কারণে মাছ উৎপাদনে এখন আমরা গর্বিত পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা আরও এগিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারব। ব্যক্তি পর্যায়ে সামগ্রিক কাজের গুরুত্ব এসে নির্ভর করে খাদ্য চাহিদা গ্রহণের ওপর। আবার রাষ্ট্রীয় পার্যায়েও একইভাবে দেশের জনসমষ্টির খাদ্য জোগান মুখ্য বিষয় হয়ে দেখা দেয়।

 

মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন
মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন

মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন

আর প্রতিটি উন্নয়ন খাতের ওপর যখন খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মুখ্য হয় তখন আর স্পষ্ট করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে সবার আগে আমাদের খাদ্য চাহিদা পূরণই হচ্ছে সব কর্মকাণ্ডের মূলমন্ত্র। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা যখন শঙ্কায় থাকে তখন দেশের আর্থসামাজিক বা অবকাঠামোগত সব উন্নয়নই গৌণ বিষয় হয়ে দেখা দেয়। সুতরাং সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। খাদ্য নিরাপত্তার কথা আসলেই নির্ভরতা বাড়ে কৃষির ওপর। চাহিদানুযায়ী খাদ্যশস্য যেমন খাদ্য নিরাপত্তার পথকে সুগম করে তেমনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মৎস্য খাত কৃষিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। কেননা দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী যেমন এ খাতের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে তেমনি খাদ্যের তালিকায় প্রোটিনের জোগানের বিষয়টিও নিশ্চিত করছে প্রতিনিয়ত। আবার মাছ খাদ্য চাহিদাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে খাদ্যের পরিপূরক সম্পূরক খাবার হিসেবে।

 

মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন
মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন

আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বাস করে কৃষি উৎপাদন নির্ভর গ্রামীণ জনপদে। ব্যবসা বাণিজ্যের মূল উৎস বিবেচনা করা হয় কৃষিকেই। আবার ছোট্ট পরিসরের এ দেশের ১৬ কোটির ওপরে বিশাল জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার পরিকল্পনাও আসে কৃষি থেকে। ২০২১ সাল আমাদের মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হবে। গৌরবময় এ অধ্যায়কে সামনে রেখে আমাদের দেশকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য মুক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ আত্মনির্ভরশীল দেশ গঠনের প্রত্যয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বর্তমান সরকার।

সরকার দেশকে খাদ্যে আত্মনির্ভর, ২.৮ কোটি বেকারের সংখ্যা ২০২১ সালের মধ্যে ১.৫ কোটিতে নামিয়ে আনা, দারিদ্র্যসীমা এবং অতি দরিদ্রতাকে ২৫ ও ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কাজে সহায়তা করতে খাদ্য নিরাপত্তায় মৎস্য সেক্টরের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের ভাবতে হবে আধুনিক পদ্ধতি প্রযুক্তি অনুসরণ করে কম থেকে বেশি উৎপাদনের কথা।

মৎস্য খাত মানুষের পুষ্টি চাহিদার ৬৩ শতাংশ পূরণ করছে। আবার মোট রপ্তানি আয়ের ৬ শতাংশ আসছে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে। এসবের পরও আমাদের এ খাতে অবদান তুলনামূলকভাবে কম। মৎস্য খাতের উৎসগুলো হলো- স্থায়ী ও মৌসুমি পুকুর ২৪১৫ হেক্টর, হাওর ৫৪৮৮ হেক্টর, সড়ক ও রেলপথ পার্শ্ববর্তী বরোপিট ১৪ হাজার হেক্টর, চা বাগানের বরোপিট ১১ হাজার হেক্টর, মাছ চাষযোগ্য ধানি জমি ৬ লাখ হেক্টর, চিংড়ি খামার (উপকূলীয়) ১৪১৩৫৩ হেক্টর, মাছ চাষযোগ্য প্লাবন ভূমি ৭ লাখ হেক্টর এবং সেচ এলাকার জলাভূমি ৭ লাখ হেক্টর। তবে এ উৎসের মধ্যেও অনেক জলাভূমি পরিকল্পনাহীনভাবে ব্যবহার হচ্ছে।

দেশের উন্নয়নে জলাভূমির পুরোটাই আনতে হবে পরিকল্পিত আধুনিকতার মধ্যে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০১৫ সালে আমাদের দেশে মোট মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫.৪০ লাখ টন। সেখানে বর্তমান উৎপাদন মাত্র ২৫ লাখ টনের কাছাকাছি। প্রতি বছর লোক বাড়ছে প্রায় ২৫ লাখ। মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে বিভিন্ন কারণে। দেশের মৎস্য উৎপাদনের সিংহভাগ অবদানই বেসরকারি বা ব্যক্তি পর্যায়ের। দেশের জনসংখ্যার মধ্যে ১.২৫ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মৎস্য খাতের সাথে জড়িত। এর মধ্যে প্রায় ১২.৫ লাখ লোক সার্বক্ষণিক এ খাতে নিয়োজিত থাকেন।

মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন
মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মৎস্য খাত উন্নয়নে যেসব ভাবা দরকার তা হলো ০১. উৎস ও বাস্তবভিত্তিক প্রাকৃতিক কৌশলে বিভিন্ন কার্যক্রম খুঁজে বাস্তবায়ন করা; ০২. সময়ভিত্তিক প্রাকৃতিক উৎসের জন্য চাষ কৌশল উপায় খোঁজা এবং তার যথার্থ ব্যবহার; ০৩. সম্পদ সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা; যাতে আইনের বেড়াজালে না আটকিয়ে, প্রয়োজনের উপলব্ধি সৃষ্টি করে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা; ০৪. এলাকাভিত্তিক কিছু পুকুর বা জলাশয়কে একত্র করে খামারভিত্তিক মাছচাষ কার্যক্রম পরিচালনা করা। এতে আন্তঃপ্রজননের বিষয়টিকে মাথায় রেখে পোনা উৎপাদন ও মাছ চাষ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। ০৫. স্কুল, মন্দির, মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে মাছ চাষের সামাজিক প্রয়োজন ও চাষ কৌশল অবহিত করা।

০৬. মিষ্টি ও লোনা পানির মাছ এবং ছোট ইলিশকে (জাটকা) বিশেষত প্রাকৃতিক উপায়ে সংরক্ষণের মাধ্যমে তা উৎপাদনে আনা প্রয়োজন। যেখানে প্রায় ৪৬৫ মিলিয়ন জাটকা ইলিশ ধরা পড়ে। এদের বড় হতে সুযোগ দিলে, দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ইলিশের যে ১২ শতাংশ অবদান, তাকে আরও বাড়ানো খুবই সহজ হবে; ০৭. মাছ চাষিদের জন্য দরকার তথ্য আদান প্রদানের জন্য সমৃদ্ধ রিসোর্স সেন্টার; ০৮. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও ঝুঁকি প্রতিরোধে সক্ষমতা উপযোগী হিসেবে চাষিদের গড়ে তোলা উচিত। ০৯. মাছ চাষের উপযোগী হিসেবে অর্থের জোগানে ঋণ প্রাপ্তিতে সহজ প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা করা; ১০. জেলেদের কথা বিবেচনা করে জলমহাল নীতিমালা প্রণয়ন করা।

মৎস্য নীতিমালা-২০০৯ কে আরও যুগোপযোগী মাছচাষিবান্ধব করা; ১১. দরিদ্রতা নিরসনে প্রকৃতিক সম্পদ, ভৌত অবকাঠামোগত সম্পদ, অর্থনৈতিক সম্পদ ও মানবসম্পদকে সমন্বয়ক বিবেচনা করে নীতিমালা তৈরি ও যথাযথ প্রয়োগ করা; ১২. মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে ডিজিটাল বাংলায় পুকুরের পাড় হতে সমুদ্রের গহিন জলরাশি পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার সাথে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা। যাতে মাছ চাষের সব কৌশল এবং পদ্ধতিগত তথ্যসহ ঝুঁকি কমানোর কারণ সম্পর্কে জেলে/চাষি সম্যক ধারণা পায়। এতে কর্মসংস্থান, আয় এবং আমিষের জোগান বাড়বে দেশ হবে স্বনির্ভর। আর সার্থক হবে ভিশন-২০২১ অভিযাত্রা।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষত আমিষের চাহিদা মেটাতে মৎস্য সম্পদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক কৃষিজীবী এবং গ্রামে বাস করে। মৎস্য চাষ এসব গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক আয় রোজগারের একটি অংশ। প্রতি বাড়ির আনাচে-কানাচে পতিত পুকুরে মাছ চাষ করা যায়। মাছ চাষে যে মনমানসিকতা, সক্ষমতা প্রয়োজন এ দেশের মানুষের তা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু এদের পরিকল্পিত উপায়ে মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করা। বর্তমানে সরকার এবং ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগে আমাদের দেশেও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতের মৎস্য চাষ শুরু হয়েছে। ফলে দেশে প্রতিনিয়তই মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটছে। স্বনির্ভর হচ্ছে দরিদ্র পরিবার এবং বেকার যুবকরাও।

বর্তমানে সারা দেশে প্রজননের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি মাছের পোনা/বীজ উৎপাদন খামার রয়েছে। পুষ্টিহীনতা দূর করতে সারা দেশে যে পরিমাণ মাছ, মাংস, দুধ, ডিম উৎপাদিত হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাকিদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগী হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে আরও বেশি করে মৎস্য খামার, যা পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সাহায্য করবে। পতিত পুকুরে আধুনিক উপায়ে মাছ চাষ, যা আমাদের দারিদ্র্যমোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রযুক্তি যেমন সহজ ও কম খরচি তেমনি দরিদ্র জনগণের জন্য উপযোগী। সুতরাং দেশের পুরো জলসীমা যথাযথ সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে।

সমকালীন বিশ্ব প্রায় সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ও চাহিদার কারণে সবক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ অনেক এগিয়ে গেছে। নতুন প্রযুক্তির বিকাশ অনেক প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি দিয়েছে কিন্তু এসব প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের অভাবে বিকাশমান দেশগুলোর মধ্যে আমরা তুলনামূলক এখনও অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। এ দেশে আগের তুলনায় মাছ চাষ বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দেশের সব জলাভূমিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা গেলে মাছের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বিশ্বের উৎপাদন কৌশল এখন বাণিজ্যভিত্তিক।

কম শ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা অর্জন এর মূল লক্ষ্য। মৎস্য সম্পদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নেই। বিশ্বের সব দেশে এখন আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের মাছ চাষ হচ্ছে। গড়ে উঠেছে উন্নত মৎস্য খামার। কৃত্রিম প্রজনন মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ব্যাপক স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। আমরাও সে পথে এগোব সাহসে প্রযুক্তিতে শক্তিতে।

মাছ চাষ প্রযুক্তি অত্যন্ত সহজ। এর সাহায্যে আমাদের দেশের শিক্ষিত ও নিরক্ষর লোকজন স্বাবলম্বী হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় মাছ চাষের যৌক্তিক মনমানসিকতা প্রয়োজন এ দেশের মানুষের তা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু এদের পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করা। মাছ চাষের জন্য প্রয়োজন উন্নত জাতের বা রোগমুক্ত পোনা, যা দ্রুত বাড়তে পারে। সাথে প্রয়োজনীয় সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। ইউরোপ ও রাশিয়া বাংলাদেশের চিংড়ির বড় বাজার। ডলারের বিপরীতে ইউরো ও রুবেলের দরপতনে সেখানে চাহিদা কমে গেছে। তাদের রিপেমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানি সহায়ক নির্দেশনা দিতে পারে। সরকার উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা দিতে পারে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রতিও নজর দিতে হবে কিভাবে উৎপাদন ব্যয় কমানো যায় সে চিন্তাও করতে হবে।

সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতিতে মাছ চাষ করলে পাল্টে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। এ দেশের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ কর্মসংস্থানের আশায় নিরন্তর চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন জীবনের পথচলায়। জীবনের বেকারত্বের গ্লানি ঘোঁচাতে এখন অনেকেই মাছ চাষের প্রতি ঝুঁকছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দেশে মাছ চাষ বাড়ছে এবং এ ধারা যদি অব্যাহত রাখা যায় তবে অতি অল্প সময়ে মাছ জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে। মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন দেশের লক্ষাধিক মানুষ। আর মাছ চাষের সফলতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। বর্তমানে স্থানীয় বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান গর্বিত অবস্থানে। ক্রমাগত ফিশারিজের সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও স্বাধীনতা-পরবর্তী ফিশারিজ থেকে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১.৬ গুণ।

দেশে ক্রমান্বয়ে মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার-২০১৬’ প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ফিশারিজ পদ্ধতিতে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মৎস্য অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মৎস্য চাষ ও মৎস্য সংরক্ষণের সাথে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ নারীও মৎস্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত। গত সাত বছরে মৎস্য খাতের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত প্রায় ০৬ লক্ষাধিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দেশে বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬১ হেক্টর। উন্মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ ৩৯ লাখ ৬ হাজার ৪৩৪ হেক্টর।

দেশে মোট হ্যাচারির সংখ্যা ৯৪৬। এর মধ্যে সরকারি মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারের সংখ্যা ১৩৬টি। আর বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারির সংখ্যা ৮৬৮টি। দেশে দিন দিন বাড়ছে মৎস্য খামারের সংখ্যা। মৎস্য অধিদফতরের ২০১৪-১৫ সালের তথ্য মতে, দেশে মৎস্য চাষির সংখ্যা ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৭ হাজার। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকেও অনেকেই এগিয়ে এসেছেন মাছ চাষে। চাষির সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে মাছের উৎপাদন। ২০০৮-০৯ সালে ২৭ দশমিক শূন্য ১ লাখ টন মাছের উৎপাদন হলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৮৪ লাখ টনে।

আর সরকারের টার্গেট ২০২১ সালের মধ্যে তা ৪৫ দশমিক ৫২ লাখ টনে উন্নীতকরণ। বর্তমানে বাজারে যেসব মাছ পাওয়া যায় তার অধিকাংশই চাষের মাছ। নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশে মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটেছে। মাছ চাষের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনেকটা সম্প্রসারিত হলেও সব সময় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না বিভিন্ন কারণে।

মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন
মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন

হাওর ও পাহাড়ির জেলায়ও মাছ চাষের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অবৈধ শিকারিদের হাত থেকে প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ রক্ষার্থে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে কাজ করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। জনসাধারণকে দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ। মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে দেশের অসংখ্য পরিবার। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন গ্রামীণ মানুষ। এতে আগের তুলনায় যেমন তাদের উৎপাদন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে মাছভিত্তিক মুনাফাও। সাধারণ জনগণও আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ মাছ গ্রহণ করতে পারছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পন্ন এলাকায় মাছ চাষের সম্প্রসারণ তেমন আশানুরূপ ঘটে না। এছাড়া গুণগত মানের হ্যাচারির অভাব, মাছের খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণেই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া মাছ বিক্রিতে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। মাছচাষিদের সরকারের কাছে দাবি, মাছ চাষকে জনপ্রিয় করে তুলতে বিদ্যুতের প্রাপ্তি যেন সহজলভ্য করে দেয়া হয়।

নদীমাতৃক দেশে পানির সোনা মাছ উৎপাদনের রয়েছে আমাদের অপার সম্ভাবনা। মিঠাপানির মাছ চাষে পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত জলাশয় আর লাখ লাখ পুকুর। পরিশ্রমী মাছচাষিদের সাথে রয়েছে অবারিত জায়গা আর মাছ চাষের রয়েছে বিশাল সুযোগ। এসব সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। আর বছরে আয় হতে পারে কয়েক বিলিয়ন ডলার। মিঠা পানির মাছ ও মাছজাতীয় পণ্য ছিল এর মাত্র ৮ শতাংশ।

চিংড়ি রফতানি থেকেই এসেছে এর প্রায় ৯২ শতাংশ। মাছ রফতানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সরকারের নীতি সহায়তা। তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে শুধু চিংড়ি রফতানি খাত থেকেই কয়েক শত কোটি মার্কিন ডলার আয় সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথমস্থানে রয়েছে চীন। এর পরই রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। আশা করা হচ্ছে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ হবে।

যদি আমরা পরিকল্পিতভাবে পুকুর নির্বাচন, তৈরি, মাছের পোনা ছাড়া, মাছের খাদ্য-স্বাস্থ্য-বালাইব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রযুক্তি অনুসরণ করে নিশ্চিত করতে পারি তাহলে মাছ চাষে আমরা অনেকটুকু এগিয়ে যেতে পারব। তখন মাছভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা আরো সুদৃঢ় হবে। আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে। আমরা আমাদের দেশীয় অভিবাসনকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারব।

 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন